ভারতের মৃত্তিকা, প্রকারভেদ ও বৈশিষ্ট্য||Soil of India in Bengali

ভারতের মৃত্তিকা, প্রকারভেদ ও বৈশিষ্ট্য||Soil of India in Bengali

 

ভারতের মৃত্তিকা

আবহবিকার দ্বারা পৃথিবীপৃষ্ঠের মূল শিলা চূর্ণবিচূর্ণ ও বিয়োজিত হওয়ার পর জৈব ও অজৈব পদার্থ মিশিয়ে সৃষ্ট উদ্ভিদ সৃষ্টির অনুকূল স্তরকে মাটি বলে। উদ্ভিদ জন্মানোর ও বেড়ে ওঠার অনুকূল হওয়ায় মাটি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ।

মাটির গুরুত্ব:- ১) পৃথিবীর সমস্ত জীবের বাসস্থল, ২) জড় উপাদানগুলির ধারক, ৩)মাটিতে উৎপন্ন ফসল মানবসমাজের খাদ্যের প্রধান উৎস।

Soil of India in Bengali

মাটির প্রকারভেদ

উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য, উদ্ভিদ ও জলবায়ুর আঞ্চলিক তারতম্য অনুসারে ভারতের মাটিকে ICAR ১৯৫৩ সালের প্রধান ৮টি ভাগে ও ২৬টি উপবিভাগে ভাগ করেছে। যথা-১) পলি মাটি, ২) কালো মাটি, ৩) ল্যাটেরাইট মাটি, ৪) লোহিত মাটি, ৫) লবণাক্ত ও ক্ষারীয় মাটি, ৬) পার্বত্য ও অরণ্য মাটি, ৭) মরু ও শুষ্ক অঞ্চলের মাটি এবং ৮) জলাভূমির মাটি।

১) পলিমাটি:

অবস্থান: ভারতের সর্বাধিক অর্থাৎ প্রায় ১৫ লক্ষ বর্গ কিমি বা ৪৬ শতাংশ অঞ্চল জুড়ে রয়েছে পলিমাটি। মাটি সিন্ধু-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র সমভূমি ও উপকূলীয় সমভূমি অঞ্চলে বিস্তৃত।

উৎপত্তি: হিমালয় পর্বতের নরম এবং মালভূমি অঞ্চলের কঠিন শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত এবং নদী দ্বারা বাহিত ও সঞ্চিত হয়ে পলিমাটি সৃষ্টি হয়েছে। উপকূল অঞ্চলের উত্তরের সমভূমি অঞ্চলের মাটি অপেক্ষা বেশি দানাযুক্ত।

গ্রথন: কাদা, পলি ও বালির আপেক্ষিক অনুপাতকে মাটির গ্রথন বলে। পলিমাটি কর্দমযুক্ত, পলি দোআঁশ, বেলে দোআঁশ প্রকৃতির হয়।

উৎপাদিত শস্য: এই মাটি উর্বর হওয়ায় কৃষিকাজে বিশেষ উপযোগী। ধান, গম, ইক্ষু, পাট, আলু প্রভৃতি এই মাটিতে উৎপন্ন হয়।

বৈশিষ্ট্য: ১) পলি মাটিতে বালির তুলনায় পলি ও কাদার ভাগ বেশি থাকে। ২) আদি শিলার পার্থক্যের জন্য পলি মাটির রং অঞ্চলে ভেদে আলাদা। ভাঙ্গার মাটির রং হালকা খয়েরি, খাদার মাটির রং ঘন খয়েরী বা কালো। ৩) মাটির গভীরতা সর্বোচ্চ সমান নয়। দক্ষিণ থেকে উত্তরে মাটির গভীরতা বেশি। ৪) এই মাটি ফসফরাস, চুন ও পটাশে সমৃদ্ধ। ৫) নাইট্রোজেন ও জৈবপদার্থের পরিমাণ কম হওয়া সত্ত্বেও এই মাটির কৃষির উপযোগী। ৬) এই মাটিতে হিউমাসের পরিমাণ বেশি।

পলি মাটির আঞ্চলিক নাম:

১) নদী তীরের পলিরাশিকে ‘খাদার’ বলে। ২) নদী থেকে দূরে সঞ্চিত পলিরাশিকে ‘ভাঙ্গার’ বলে। ৩) ভাঙ্গার অঞ্চলের দানাযুক্ত মাটিকে ‘কঙ্কর’ বলে। ভাঙ্গরে চুন জাতীয় পদার্থ বেশি থাকলে তাকে ‘ঘুটিং’ বলে। ৪) উচ্চগঙ্গা সমভূমির জলাভূমির মাটিকে ‘ধাঙ্গার’ বলে। ৫) পর্বতের পাদদেশে নুড়ি, পলি ও বালি গঠিত মাটিকে ‘ভাবর’ বলে।

২) কৃষ্ণ মৃত্তিকা বা কালো মাটি:

অবস্থান: ভারতের প্রায় ৫.৫০ লক্ষ বর্গকিমি বা ১৭% অঞ্চল জুড়ে কৃষ্ণমৃত্তিকা বিস্তৃত। মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশের পশ্চিম অংশ, গুজরাটের দক্ষিণাংশ, অন্ধ্রপ্রদেশের উত্তর-পশ্চিম অংশ, উত্তর ও তামিলনাড়ুর উত্তর অংশ জুড়ে কৃষ্ণমৃত্তিকা বিস্তৃত।

গ্ৰথন: উপত্যকার নিম্ন অংশে কাদা ও ওপরের অংশে মাটির গ্রথন কাদা দোআঁশ প্রকৃতির।

উৎপত্তি: স্বল্প বৃষ্টিপাতের প্রভাবে ব্যাসল্ট শিলা থেকে কৃষ্ণ মৃত্তিকা সৃষ্টি হয়। তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানায় নিস ও সিস্ট থেকে এই মাটি তৈরি হয়।

উৎপাদিত শস্য: কৃষ্ণ মৃত্তিকার প্রধান ফসল কার্পাস। তাই এই মাটিকে কৃষ্ণ কার্পাস মৃত্তিকা বা ‘Black Cotton Soil’ বলে। এছাড়া মিলেট, তৈলবীজ, তামাক পেঁয়াজ, যব, আলু ইত্যাদি এই মাটির প্রধান ফসল।

বৈশিষ্ট্য: ১) টাইটানিয়াম অক্সাইডের পরিমাণ বেশি থাকায় এই মাটির রং কালো। ২) পলি ও কাদার ভাগ বেশি হওয়ায় (৫০-৮০%) এই মাটির জল ধারণ ক্ষমতা বেশি। ৩) এই মাটিতে অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড ১০, লৌহ অক্সাইড ৯-১০, ম্যাগনেসিয়াম কার্বনেট ৬-৮ অনুপাতে থাকে। ৪) এই মাটিতে পটাশ, ফসফেট, ফসফরিক অ্যাসিড, নাইট্রোজেন ও হিউমাসের পরিমাণ কম। ৫) বিভিন্ন খনিজে সমৃদ্ধ হওয়ায় এই মাটি খুব উর্বর।

৩) লোহিত মাটি:

অবস্থান: ভারতের প্রায় ৩.৫ লক্ষ বর্গ কিমি বা ১১% অঞ্চল জুড়ে রয়েছিল লোহিত মাটি। কর্নাটকে, মহারাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে, অন্ধ্রপ্রদেশের পূর্বভাগে, মধ্যপ্রদেশে, উড়িষ্যা, ঝাড়খন্ড, উত্তরপ্রদেশের দক্ষিণাংশ, পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া ও বীরভূম জেলায় এবং উত্তর-পূর্বের নাগাল্যান্ড, মনিপুর, মিজোরাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয় রাজ্যে লোহিত মাটি দেখা যায়।

উৎপত্তি: অধিক উষ্ণতা ও আর্দ্রতার প্রভাবে এই অঞ্চলের প্রাচীন আগ্নেয় (মূলত গ্ৰানাইট) ও রূপান্তরিত শিলা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে এবং বিয়োজিত হয়ে লোহিত মাটি সৃষ্টি হয়।

গ্ৰথন: ইহা পলি দোআঁশ, বেলে-দোআঁশ প্রকৃতির গ্ৰথন যুক্ত হয়।

উৎপাদিত শস্য: সাধারণত এই মাটি অনুর্বর। তবে জলসেচ ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে বর্তমানে মিলেট, বাদাম, ভুট্টা, কফি, সয়াবিন, আঙ্গুর, আলু ইত্যাদির চাষ করা হয়।

বৈশিষ্ট্য: ১) এই মাটির লোহিত মিশ্রিত হওয়ায় এর রং লাল। তবে আদ্রতার উপস্থিতিতে এই মাটির রং কোথাও কোথাও হলুদ রঙের হয়। ২) পলি ও বালির কণা এই মাটিতে বেশি থাকে। ৩) ম্যাগনেসিয়াম, ফসফেট নাইট্রোজেন ও হিউমাসের পরিমাণ কম। তবে পটাশের পরিমাণ বেশি। ৪) মাটির জল ধারণ ক্ষমতা কম। ৫) এই মাটি অনুর্বর প্রকৃতির, PH-এর মাত্রা ৬.৬-৮.০ ।

৪) ল্যাটেরাইট মাটি:

অবস্থান: ভারতের প্রায় ২.৫০ লক্ষ্য বর্গ কিমি বা ৮% স্থান অধিকার করে রয়েছে ল্যাটেরাইট মাটি। পূর্বঘাট পার্বত্য অঞ্চল, রাজমহল পাহাড়, সাতপুরা, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, ঝাড়খন্ড, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, পশ্চিমঘাট পর্বত, মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গ ইত্যাদি অঞ্চলে ল্যাটরাইট মাটি দেখতে পাওয়া যায়।

উৎপত্তি: অধিক উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাতের ফলে আবহবিকার গ্রস্থ প্রাচীন শিলাস্তর থেকে সিলিকা ও অন্যান্য খনিজ পদার্থ বেরিয়ে আসার পর পড়ে থাকে লোহা ও অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইডের যৌগ। এই যৌগগুলি থেকে ল্যাটেরাইট মাটির সৃষ্টি হয়।

গ্ৰথন: ইহা মোটা দানা ও ছিদ্রযুক্ত হয়।

উৎপাদিত শস্য: অনুর্বর, হওয়ায় কৃষিকাজের সহায়ক না হলেও জলসেচ ও সারপ্রয়োগ করে চা, কফি, রবার, বাদাম, রাগি, কাজুবাদাম ইত্যাদির চাষ করা হয়।

বৈশিষ্ট্য: ১) এই মাটি লাল, বাদামি, হলদে রংয়ের হয়। ২) এই মাটিতে লোহা, অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ অক্সাইড উপস্থিত থাকে। ৩) জলপূর্ণ অবস্থায় মাটি নরম ও থকথকে, কিন্তু শুকিয়ে গেলে সেসক্যুই অক্সাইড এর আধিক্য হেতু এই মাটির ইটের মতো শক্ত হয়ে যায়। ৪) এই মাটিতে জৈব পদার্থ প্রায় নিয়ে বললেই চলে। ৫) এতে চুন, ম্যাগনেসিয়াম ও নাইট্রোজেনের পরিমাণ কম থাকে। ৬) এই মাটি আম্লিক প্রকৃতির।

৫) মরু অঞ্চলের মাটি বা সিরোজেম মাটি:

অবস্থান: ভারতের প্রায় ১.৪২ লক্ষ বর্গ কিমি বা মোট ক্ষেত্রমানের প্রায় ৪.৩২% স্থান অধিকার করে আছে মরু অঞ্চলের মাটি। রাজস্থানের থর মরুভূমি, পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও গুজরাটের কিছু অংশে এই মাটি দেখা যায়।

উৎপত্তি: বৃষ্টি কম হওয়ার জন্য যান্ত্রিক আবহবিকারের প্রভাবে এই মাটির সৃষ্টি হয়েছে।

গ্ৰথন: এই মাটির গ্ৰথন বেলে এবং বেলে দোআঁশ প্রকৃতির হয়।

উৎপাদিত শস্য: পর্যাপ্ত পরিমাণ জল সেচের ব্যবস্থা করলে গম, যব, মিলেট, তুলা, ডাল, ভূট্টা ইত্যাদি চাষ করা যায়।

বৈশিষ্ট্য: ১) এই মাটিতে বালির পরিমাণ বেশি (৯০-৯৫%)। ২) মাটির রং বাদামি ও হলুদ। ৩) মাটিতে লবণের ভাগ বেশি, কিন্তু জৈব পদার্থের পরিমাণ কম, তাই মাটি অনুর্বর। ৪) এই মাটির জল ধারণ ক্ষমতা কম। ‌৫) ফসফেট ও নাইট্রেট এর উপস্থিতির কারণে আর্দ্রতার প্রভাবে এই মাটি উর্বর হয়ে ওঠে। ৬) অধিক বাষ্পীভবনের ফলে দ্রবীভূত লবণ নীচ থেকে মাটির উপরে উঠে এসে সঞ্চিত হয়।

৬) পার্বত্য মাটি:

অবস্থান: ভারতে ২.৮৫ লক্ষ বর্গ কিমি বা ৮.৭% অঞ্চল পার্বত্য মাটির অধীন। উত্তরে হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে, দক্ষিনে নীলগিরি ও পশ্চিমঘাট পর্বতের বনভূমি অঞ্চলে এই মাটি দেখা যায়। আবার, হিমালয়ের উপত্যকা ও খাত গুলিতে এই মাটি দেখা যায়।

উৎপত্তি: বিয়োজিত জৈব পদার্থ শিলাচূর্ণের সাথে মিশে এই মাটির সৃষ্টি হয়।

গ্ৰথন: এই মাটি স্থূলকণা যুক্ত হয়।

উৎপাদিত শস্য: অনুর্বর হলেও এ মাটিতে চা, কফি, বিভিন্ন মশলা, ফল ইত্যাদি চাষ হয়।

বৈশিষ্ট্য: ১) মাটির গ্ৰথন দোআঁশ ও পলি দোআঁশ প্রকৃতির। ২) মাটির রং ঘন কালো ও ধূসর বাদামী। ৩) মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বেশি। ‌৪) পটাশ ও ফসফরাসের পরিমাণ কম, তাই মাটি অনুর্বর প্রকৃতির। ৫) স্যার প্রয়োগে এই মাটি উর্বর হয়ে ওঠে। ৬) এই মাটির পৃষ্ঠস্তরে জৈব পদার্থ ও বালি সঞ্চিত হয়ে পডজল তৈরি হয়।

মাটির গ্রথন কি?

উত্তর:- কাদা, পলি ও বালির  অনুপাতকে মাটির গ্ৰথন বলে। মাটির গ্ৰথনের উপর নির্ভর করে সেই মাটির জল ধারণ ক্ষমতা, জলের অনুপ্রবেশের পরিমাণ, বায়ু চলাচল, উর্বরতা, উদ্ভিদের শিকড়ের প্রবেশ্যতা ইত্যাদি।

 

 

আরও পড়ুন:- ভারতের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য 

Leave a comment